দৃশ্য ১: হরিদাসের বাড়ির সামনে রাস্তায় (ভোরবেলা)
মোড়ল মশাইয়ের হাতে একটি থালা, তাতে কিছু ফল ও মিষ্টি।
মোড়ল মশাই : হরিদাস, গত রাতের সেই অলৌকিক ঘটনার পর আমি সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। আমার অপরাধের কি কোনো শেষ নেই? এই সামান্য সেবাটুকু গ্রহণ করো।
হরিদাস (মৃদু হেসে): মোড়ল মশাই, অপরাধ তো তখনই ধুয়ে গেছে যখন আপনি সত্যকে চিনেছেন। ভগবান তো কেবল ভাবগ্রাহী, তিনি বস্তুর কাঙাল নন। আপনার এই ভক্তিই তাঁর শ্রেষ্ঠ ভোগ।
মোড়ল মশাই : আচ্ছা ঠিক আছে ঠাকুর আমি আপনার কথা পালন করব।
হরিদাস : আচ্ছা বেশ, মুরল মশাই আপনি যখন এসেই গিয়েছেন তাহলে আমার সঙ্গে চলুন নিজে হাতে শ্রীকৃষ্ণের চরণে ভোগ দিয়ে যাবেন।
মোড়ল মশাই : তবে তাই চলুন হরিদাস ঠাকুর
(হরিদাস হাঁটছেন, পেছনে একদল গ্রামবাসী। পথে এক বৃদ্ধা (সহজ চরিত্র) লাঠি ভর দিয়ে হাঁটছে এবং ক্লান্ত হয়ে পড়ে যাচ্ছে। মোড়ল মশাই প্রথমে তাকে এড়িয়ে যেতে চান, কিন্তু হরিদাস থেমে যান।)
হরিদাস: মোড়ল মশাই, দেখলেন তো? পরীক্ষা এখনো শেষ হয়নি।
মোড়ল মশাই (অবাক হয়ে): মানে? এই বৃদ্ধার সাথে পরীক্ষার কী সম্পর্ক?
হরিদাস: যে ভগবানকে আপনি গত রাতে কুঁড়েঘরে দেখেছিলেন, সেই ভগবানই আজ এই জীর্ণ শরীরে আপনার সাহায্য চাইছেন। আপনি কি পারবেন আপনার এই রেশমি চাদর দিয়ে ওনার ধুলোমাখা শরীরটা মুছিয়ে দিতে?
(মোড়ল মশাই দ্বিধায় পড়েন, কিন্তু হরিদাসের শান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের দামি চাদর দিয়ে বৃদ্ধার সেবা করেন।)
বৃদ্ধা (আশীর্বাদ করে): বাবা, তোমার মঙ্গল হোক। তুমি আজ আমার প্রাণ বাঁচালে।
হরিদাস (হাসিমুখে): দেখলেন তো মোড়ল মশাই, মন্দিরের বিগ্রহের চেয়ে জীবন্ত দেবতার সেবা করা কত কঠিন, কিন্তু কত আনন্দময়!
হা গুরুদেব আপনি ঠিক বলেছেন, আমাদেরকে এই ভাবেই পথ দেখবেন ঠাকুর।
যত দিন ভগবানের ইচ্ছা ততদিন দেখবো, সামনে এগিয়ে চল,
দৃশ্য 2: পরদিন – গ্রামের আলোচনায় তর্কবাগীশ আগমন
মোড়ল মশাই (উচ্চস্বরে): শুনুন গ্রামবাসী! কাল যা আমরা দেখেছি, তা কোনোদিন কল্পনাও করতে পারিনি। হরিদাস কোনো সাধারণ মানুষ নয়, তিনি স্বয়ং ভগবানের প্রিয়। আজ থেকে এই গ্রামে আর কেউ অভুক্ত থাকবে না, আর হরিদাসের কুঁড়েঘর হবে আমাদের তীর্থস্থান।
(মোড়ল মশাই ঠিক করেন গ্রামে একটি বড় 'অন্নসত্র' বা কাঙালী ভোজন করাবেন হরিদাসের হাত দিয়ে। কিন্তু ঠিক সেই সময় পাশের গ্রাম থেকে এক কুটিল পন্ডিত বা তান্ত্রিকের আগমন ঘটে, যে হরিদাসের এই জনপ্রিয়তা সহ্য করতে পারছে না।)
তর্কবাগীশ (কুটিল হাসি দিয়ে): মোড়ল মশাই, আপনি কি নিশ্চিত যে কাল যা দেখেছেন তা জাদুবিদ্যা ছিল না? সাধারণ এক হরিদাসকে নিয়ে এত মাতামাতি? শাস্ত্র না জেনে, মন্ত্র না পড়ে শুধু 'হরিনাম' করলেই কি ভগবান আসে?
মোড়ল মশাই (দৃঢ় কণ্ঠে): পন্ডিত মশাই, ভক্তি শাস্ত্রে থাকে না, থাকে হৃদয়ে। আমরা তা নিজের চোখে দেখেছি।
তর্কবাগীশ: তবে হোক আরও একটি পরীক্ষা! যদি হরিদাস সত্যিই ভক্ত হয়, তবে আজ এই শুকনো কাঠের টুকরো থেকে সে ফুল ফুটিয়ে দেখাক। যদি পারে, তবেই আমি মানব।
হরিদাসকে ডাকতে পাঠানো হয়।
দৃশ্য ৩: হরিদাসের নতুন পরীক্ষা
গ্রামবাসী চিন্তিত। হরিদাসকে ডেকে আনা হয়। হরিদাস হাসিমুখে সেই শুকনো কাঠের টুকরোটি হাতে নেন।
হরিদাস (করজোড়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে): হে দয়াময়, আমার কোনো শক্তি নেই। কিন্তু এই পন্ডিত মশাই আজ তোমার নামকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তোমার মহিমা তুমিই রক্ষা করো প্রভু।
হরিদাস (গান গাইতে শুরু করেন): "নামেরই মহিমা যদি থাকে জীবনে... তবে কেন ফুল ফুটবে না এই শুষ্ক কাননে?"
(অলৌকিক দৃশ্য): হরিদাস যখনই কাঠের উপর চোখের জল ফেলেন এবং 'কৃষ্ণ' নাম উচ্চারণ করেন, দেখা যায় শুকনো কাঠ থেকে ছোট ছোট তুলসী পাতা আর সুগন্ধি ফুল ফুটে উঠছে। পুরো গ্রাম 'জয় হরি' ধ্বনিতে ফেটে পড়ে। পন্ডিত মশাই স্তব্ধ হয়ে হরিদাসের পায়ে লুটিয়ে পড়েন।
পন্ডিত ! আমি ভুল করেছি… আমি তোমাকে সন্দেহ করেছি… আমাকে ক্ষমা করো!
হরিদাস (তাকে তুলে ধরে):
না মশাই, আমি কে ক্ষমা করার? সবই প্রভুর ইচ্ছা… আমি শুধু তাঁর নামের ভিখারি। আপনারা আমাকে বড় করবেন না, বড় করুন সেই দয়াময়কে।
দৃশ্য ৪: মহা অন্নদান ও হরিদাসের অন্তিম শিক্ষা
(গ্রামের সবাই মিলে বিশাল ভোজের আয়োজন করে। হরিদাস নিজ হাতে সবাইকে অন্ন বিলি করছেন। সেখানে ধনী-দরিদ্র, উঁচু-নিচু কোনো ভেদাভেদ নেই।)
হরিদাস (সবাইকে উদ্দেশ্য করে): মনে রাখবেন, মানুষের সেবা আর অন্নদানই হলো শ্রেষ্ঠ ধর্ম। পেটে খিদে নিয়ে কেউ যেন ভগবানের নাম ভুলে না যায়। আজ থেকে এই গ্রামে যেন কেউ অভুক্ত না থাকে।
মোড়ল মশাই: হরিদাস, তুমি আমাদের গ্রামকে স্বর্গ করে দিলে। আমাদের ছেড়ে কোথাও যেও না।
হরিদাস: আমি তো চলব সেই বাঁশির টানে বৃন্দাবনে ... যেখানে তাঁর নাম সেখানেই আমি। তবে মনে রেখো, ভক্তি থাকলে ভগবান তোমার ঘরেই বাঁধা পড়বেন।
দৃশ্য 5: বটতলার বিচার সভা (দুপুর)
আগের মতো অহংকারী বিচার সভা নয়, এখন সবাই গোল হয়ে বসে আছে। মোড়ল মশাই হরিদাসের সামনে হাত জোড় করে বসে আছেন।
গ্রামবাসী ১: হরিদাস, গ্রামের সবাই এখন তোমার কাছে দীক্ষা নিতে চায়। তুমি আমাদের ছেড়ে যেও না।
হরিদাস (একটু উদাস হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে): ভাই, আমি তো নিমিত্ত মাত্র। দীক্ষা তো দেন স্বয়ং গোবিন্দ। আমি তো আজ এই গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্রভুর ডাক এসেছে অন্য কোথাও।
মোড়ল মশাই: হরিদাস, আমি এই গ্রামের মোড়লগিরি ছেড়ে দিতে চাই। আমি এখন তোমার সাথে বৃন্দাবনে যেতে চাই।
হরিদাস (গম্ভীর কিন্তু দয়ালু কণ্ঠে): না মোড়ল মশাই, পালানো মানেই ভক্তি নয়। আপনি এই গ্রামেই থাকুন। আগে আপনি নিজের ক্ষমতায় মানুষকে ভয় দেখাতেন, এখন নিজের ভালোবাসা দিয়ে মানুষের সেবা করুন। সেটাই হবে আপনার আসল বৃন্দাবন।
গ্রামবাসী ২: হরিদাস, আমাদের জন্য কিছু উপদেশ দিয়ে যাও যা আমরা সারাজীবন মনে রাখব। হরিদাস: উপদেশ একটাই—কাউকে ঘৃণা করবেন না। কারো মনে কষ্ট দিলে স্বয়ং গোবিন্দের মনে কষ্ট দেওয়া হয়। নাম সংকীর্তন করুন আর মানুষের সেবা করুন।
দৃশ্য ৪: বিদায় বেলা - গ্রামের সীমানা (বিকেল)
(সূর্য ডুবে যাচ্ছে। গোধূলি বেলা। হরিদাস তাঁর একতারা নিয়ে গান ধরছেন— "হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ..."। গ্রামবাসী সবাই কাঁদছে।)
হরিদাস (সবার মাথায় হাত রেখে): কাঁদবেন না। শরীর দূরে গেলেও নাম তো আপনাদের কাছেই আছে। যখনই খুব একা লাগবে, নাম জপ করবেন। দেখবেন আমি আপনাদের পাশেই আছি।
মোড়ল মশাই (হরিদাসের পা জড়িয়ে ধরে): ধন্য হলাম হরিদাস! এই অধমকে মানুষ করার জন্য তুমি এলে। (হরিদাস ধীরে ধীরে মেঠো পথ ধরে হেঁটে চলে যাচ্ছেন। তাঁর গানের সুর ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। ক্যামেরা মোড়ল মশায়ের ওপর ফোকাস করে, যিনি একা দাঁড়িয়ে হরিদাসের ফেলে যাওয়া পথের ধুলো কপালে ছোঁয়াচ্ছেন।)
দৃশ্য ৫: শেষ দৃশ্য (উপসংহার)
(হরিদাস চলে যাওয়ার পর, সেই বৃদ্ধা এবং অন্যান্য গ্রামবাসীরা মিলে হরিদাসের কুঁড়েঘরের সামনে একটি বড় তুলসী মঞ্চ তৈরি করছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে হরিদাসের গলার সেই গানটি আবার জোরে বাজতে শুরু করে।)
ভয়েস ওভার (গম্ভীর কণ্ঠে): "সাধু আসে, সাধু যায়—কিন্তু রেখে যায় ভক্তির অক্ষয় আলোকবর্তিকা।
