চরিত্রসমূহ
ব্যাধ, স্ত্রী, হরিণী, হরিণ, শাবক, ভগবান শিব
দৃশ্য ১
স্ত্রী:
শোনো, আর কতদিন এভাবে চলবে? ঘরে অন্ন নেই, বাচ্চারা ক্ষুধায় কাঁদছে। আমার বুক ফেটে যাচ্ছে।
ব্যাধ:
আমি কি চাই এভাবে বাঁচতে? বন চষে বেড়াই, তবু সবদিন শিকার মেলে না।
স্ত্রী:
তুমি না গেলে আমরা বাঁচব কীভাবে? আজ খালি হাতে ফিরো না।
ব্যাধ:
আজ আমি শপথ করছি, শিকার ছাড়া ফিরব না। যত রাতই হোক।
স্ত্রী:
ভগবান তোমার সহায় হোন।
ব্যাধ:
ভগবান? আমার জীবনে ভগবানের স্থান কোথায়? আমার ভগবান হলো এই ধনুক আর বাণ।
দৃশ্য ২
ব্যাধ:
সারাদিন ঘুরলাম, একটা পশুও চোখে পড়ল না। বনও যেন আজ আমাকে তুচ্ছ করছে।
ব্যাধ:
ঠিক আছে, এই জলাশয়ের পাশে অপেক্ষা করি। তৃষ্ণা তো সবাইকে টানে। যে-ই আসবে, তার শেষ আজ।
দৃশ্য ৩
হরিণী:
হে মানুষ, তোমার হাতে ধনুক দেখেই বুঝেছি আমার মৃত্যু সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আমার একটি প্রার্থনা আছে।
ব্যাধ:
প্রার্থনা? প্রাণ বাঁচাতে চাও?
হরিণী:
হ্যাঁ, কিন্তু নিজের জন্য নয়। আমার একটি ছোট শাবক আছে। সে এখনো আমার দুধ খায়। আমাকে একবার তাকে দেখে আসতে দাও। আমি ফিরে আসব।
ব্যাধ:
তুমি কি আমাকে বোকা ভাবছ? মৃত্যু জেনে কেউ ফিরে আসে?
হরিণী:
আমি মিথ্যা বলব না। সত্য ভেঙে বাঁচতে চাই না।
ব্যাধ:
তোমার প্রাণের দাম আছে। কেন ফিরবে?
হরিণী:
কারণ আমি মায়ের ধর্ম ত্যাগ করতে পারি না। আর সত্য ভঙ্গ করে সন্তানকে কী শিক্ষা দেব?
ব্যাধ:
যদি পালিয়ে যাও?
হরিণী:
তবে আমার পাপ আমারই হোক। কিন্তু একবার যেতে দাও।
ব্যাধ:
ঠিক আছে। যাও। কিন্তু মনে রেখো, আমি অপেক্ষা করব।
দৃশ্য ৪
হরিণ:
হে ব্যাধ, আমার স্ত্রী কি এখানে এসেছিল?
ব্যাধ:
হ্যাঁ। সে প্রাণভিক্ষা চেয়ে গেছে। বলেছে ফিরবে।
হরিণ:
সে অবশ্যই ফিরবে। সে মিথ্যা বলতে জানে না।
ব্যাধ:
তুমি এত নিশ্চিত কেন?
হরিণ:
কারণ আমরা সত্যকে ভয় করি না। আমাকেও একবার সন্তানদের দেখে আসতে দাও। আমরা তিনজন একসাথে ফিরে আসব।
ব্যাধ:
তোমরা কি মৃত্যুকে এত সহজ ভাবো?
হরিণ:
মৃত্যু ভয়ংকর নয়। অসত্য ভয়ংকর।
ব্যাধ:
যাও। কিন্তু যদি না ফেরো, তোমাদের আর খুঁজে পাব না ভেবো না।
হরিণ:
আমরা প্রতিজ্ঞা করছি, আমরা ফিরব।
( বাকি ছিল )
মা হরিণ - সবই বুজলাম কিন্তু হে প্রভু আপনি ছাড়া এই ছেলে গুলোকে কে দেখবে কে খাবার এনে দিবে তাই আপনি থাকুন আমি শিকারীর কাছে যাব, কারণ তাকে আমি কথা দিয়ে এসছি।
বাবা হরিণ - তোমরা সবাই থাক আমি যায় কারণ বাছাদের সুরক্ষা মাযের কাছে
বাছা হরিণ - আরে নানা আমিও তাকে কথা দিয়ে এসছি সেই জন্য আমি যাব।
দৃশ্য ৫
ব্যাধ:
রাত গভীর হচ্ছে। ক্ষুধায় পেট জ্বলছে। তবু অপেক্ষা করছি। ওরা নিশ্চয়ই আর ফিরবে না।
ব্যাধ:
আমি কত প্রাণ নিয়েছি। কেউ তো ফিরে আসেনি মৃত্যুর মুখে।
ব্যাধ:
হয়তো আমিও বোকা হয়েছি ওদের কথায় বিশ্বাস করে।
দৃশ্য ৬
হরিণী:
হে ব্যাধ, আমি ফিরে এসেছি।
হরিণ:
আমিও এসেছি।
শাবক:
আমরাও এসেছি, যেমন কথা দিয়েছিলাম।
ব্যাধ:
তোমরা সত্যিই ফিরে এলে? পালাতে পারতে!
হরিণী:
সত্য থেকে পালালে নিজের চোখে চোখ রাখতে পারতাম না।
হরিণ:
আমরা সন্তানকে শিখাই—প্রাণের চেয়ে ধর্ম বড়।
শাবক:
হে মানুষ, যদি মা-বাবাকে হত্যা করো, আমাকেও করো। আমি একা বাঁচব না।
ব্যাধ:
তুমি তো ছোট! তুমি মরতে চাও?
শাবক:
মা-বাবা ছাড়া জীবন কেমন? তাদের ছাড়া বাঁচা মানে শূন্যতা।
দৃশ্য ৭
ব্যাধ:
তোমরা পশু হয়েও এমন কথা বলো! আর আমি মানুষ হয়ে শুধু হত্যা করেছি।
হরিণী:
মানুষের হৃদয়ে দয়া থাকলে সে দেবতার সমান।
হরিণ:
আজ তোমার হাতে আমাদের মৃত্যু, কিন্তু তোমার হৃদয়ে কি দয়া নেই?
ব্যাধ:
আমি… আমি জানি না। আমার হাত কাঁপছে কেন?
শাবক:
তুমি কি আমাদের মারবে?
ব্যাধ:
না… না! আজ আমার বাণ উঠছে না। তোমাদের চোখে আমি ভয় নয়, বিশ্বাস দেখছি।
হরিণী:
তাহলে আমাদের মুক্তি দাও।
ব্যাধ:
তোমরা মুক্ত। আজ থেকে আমি আর শিকার করব না।
হরিণ:
তুমি সত্যিই আমাদের ছেড়ে দিচ্ছ?
ব্যাধ:
হ্যাঁ। তোমরাই আমাকে শিক্ষা দিয়েছ—দয়া ও সত্যই বড়।
দৃশ্য ৮
ভগবান শিব:
হে ব্যাধ!
ব্যাধ:
এই কণ্ঠ… এই আলো… আপনি কে?
ভগবান শিব:
আমি মহাদেব। আজ তুমি অজান্তেই আমার পূজা করেছ।
ব্যাধ:
আমি পূজা করেছি? আমি তো কিছুই জানতাম না!
ভগবান শিব:
তুমি উপবাসে ছিলে, রাত্রি জেগে ছিলে, বেলপাতা অর্পণ করেছ। আর সবচেয়ে বড়—হৃদয়ে দয়া জাগিয়েছ।
ব্যাধ:
প্রভু! আমি তো পাপী, নিষ্ঠুর শিকারী!
ভগবান শিব:
অনুতাপই মুক্তির পথ। হৃদয়ের পরিবর্তনই সত্য পূজা।
ব্যাধ:
আমার পাপ কি ক্ষমা হবে?
ভগবান শিব:
যে অনুতাপে জ্বলে, সে শুদ্ধ হয়। আজ থেকে তোমার পাপ ক্ষয় হল।
হরিণী:
প্রভু, আমরা কি আশীর্বাদ পাব?
ভগবান শিব:
তোমরা সত্য রক্ষা করেছ। তোমরাও ধন্য।
হরিণ:
প্রভু, আজকের এই রাত কি স্মরণীয় হবে?
ভগবান শিব:
এই শিবরাত্রির রাত তোমাদের মুক্তির রাত হয়ে থাকবে।
ব্যাধ:
প্রভু, আজ থেকে আমি আপনার শরণাগত। আর কখনো হত্যা করব না।
ভগবান শিব:
সত্য, দয়া ও ভক্তি—এই তিনেই আমার বাস। সেই পথে চলো।
শাবক:
তাহলে আজ আমরা বাঁচলাম?
ভগবান শিব:
শুধু তোমরা নয়, এই ব্যাধও আজ নতুন জীবন পেল।
ব্যাধ:
প্রভু, আজ বুঝলাম—দয়া ছাড়া মানুষ পূর্ণ হয় না।
ভগবান শিব:
এই উপলব্ধিই তোমার মুক্তি।
